মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষী চন্দ্রঘোনার সবুজ সংঘ ক্লাব এখন জরাজীর্ণ 

মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষী চন্দ্রঘোনার সবুজ সংঘ ক্লাব এখন জরাজীর্ণ

সালটা ১৯৭১। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এক অবিস্মরণীয় ইতিহাসের নাম। ঠিক ২৫ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার এক থেকে দেড় মাস আগেই মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়েছিল কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনাস্থ সবুজ সংঘ ক্লাবে। ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবই মুক্তিযুদ্ধে রেখেছিল অনন্য অবদান। ক্লাবের দেওয়ালে-মাঠে আজও যেন মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর অসংখ্য স্মৃতি ধ্বনিত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় বর্তমানে ক্লাবটি জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। ভাঙাচোরা দরজা, ছেঁড়া জানালা এবং ঝুঁকিপূর্ণ টিনের চালের কারণে ইতিহাসের এই স্মারক ধ্বংসপ্রায়। স্থানীয়রা নতুন প্রজন্মের জন্য ক্লাবটির সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।

ঠিক সেই সময়ে ক্লাবটির ইতিহাসের কথা এই প্রতিবেদকের কাছে তুলে ধরেছেন কাপ্তাইয়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বর্তমান সভাপতি মো. শাহাদাৎ হোসেন চৌধুরী। 

তিনি বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম যে যে-কোনো সময় স্বাধীনতার ডাক আসতে পারে। তাই এক থেকে দেড় মাস আগেই সবুজ সংঘে মিলিত হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করি। নেতৃত্ব দিতেন আমার বড় ভাই, প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মো. শাহ আলম চৌধুরী এবং তখনই এই সবুজ সংঘ ক্লাবের ব্যানারেই আন্দোলন সংগ্রামের সূচনা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওই ক্লাব থেকেই তৎকালীন চন্দ্রঘোনার বাসিন্দা বীর প্রতীক একেএম ইসহাক, মো. আজিমসহ আরও সিনিয়র কয়েকজন মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন প্রস্তুতি সম্পন্ন করতেন। মশাল মিছিল শেষে আমরা সবুজ সংঘে এসে আশ্রয় নিতাম, পোস্টার তৈরি করতাম এবং নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতাম। পরে পাশের ম্যাটারনিটি সেন্টারকে মূল সদর দপ্তর হিসেবে বেছে নিয়ে কার্যক্রম চালানো হতো।’

‘এসময় সিনিয়রদের পাশাপাশি আমি ও আমার সহযোদ্ধা রমজান আলী, মো. বাদশা, সিরাজ ইসলাম বাঙালিসহ আরো কয়েকজন একসাথে সংগঠিত হই। ওইসময় সিনিয়রদের আদেশে আমরা বিভিন্ন অপারেশন পরিচালনা করতাম।’

শাহাদাৎ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘স্বাধীনতা ঘোষণার আরো আগ থেকেই বীর উত্তম ডা. শাহ আলম এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনসুর (বাবলু) সহ কয়েকজন দুইটি কাপড়ের বাংলাদেশের মানচিত্র সম্বলিত পতাকা, এক বান্ডেল নিউজ প্রিন্টে লেখা জাতীয় সংগীত ও পতাকা প্রিন্ট করে সংগ্রহে রেখেছিলাম। যা পরবর্তীতে লিডার মাহাফুজ, সাবের আজম আজমেরি, এসএম ইউসুফ, ইন্দ্র নন্দন দত্ত ও উনার সংগ্রহে ছিলো।’ 

একটি অপারেশনের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমিসহ আরো দুই-তিনজন সহযোদ্ধা এই স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার আগেই চন্দ্রঘোনাস্থ কেপিএম এলাকার ১৪ নং বাংলোয় একটি অভিযান চালাই। সে সময় ওই এলাকার পাহাড়ের উপর একটি বড় ওয়্যারলেস টাওয়ার ছিলো। যার মাধ্যমে পাকিস্তানিরা যোগাযোগ রাখতো। সেখানে দায়িত্বে থাকা দুই প্রহরীকে অজ্ঞান করে সেই টাওয়ারটির মেশিনটি আমরা নিয়ে আসি। এতে পাকিস্তানিদের যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে যায়।’ 

পরবর্তীতে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। 

এই মুক্তিযোদ্ধা জানান, মুক্তিযুদ্ধে ৫৮ বছরের পুরানো চন্দ্রঘোনার ঐতিহাসিক সবুজ সংঘ ক্লাবটি অনেক অবদান রেখেছে। তবে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে।  দরজা, জানালাসহ উপরের টিনের চাল ভেঙে পড়ে ক্লাবটির। অনেকটা অবহেলিত ও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে ঐতিহাসিক ক্লাবটি। 

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই সবুজ সংঘ ক্লাবটিকে সংরক্ষণ করে উন্নয়ন করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

 

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *